তাদের সন্দেহ তাদের শক্তি। তারা সন্দেহ দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে তাদের সকল বিদ্যা-অবিদ্যা, সকল যৌনতা-অযৌনতা। তারা তাদের সন্দেহ করার ক্ষমতায় নিজেদের ঘর খুঁজে পায়, নিজেদের ঘর হারায়; নিজেদেরকে হারায়, নিজেদেরকে পায়। তারা— হরিণগাছী গ্রামের পুরুষেরা, হরিণগাছী গ্রামের নারীরা, মাঝে মাঝে পচা মালিথার মেয়ে রূপালী কিংবা সাজু দারোগার বৌ রূপালীকে হরিণগাছী গ্রামে না দেখতে পেলে সন্দেহের শক্তি ও জ্ঞান প্রয়োগ করে তার অবস্থান বিষয়ে। আর সন্দেহ থেকে তারা তাদের অস্তিত্ব চিহ্নিত করে, অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে।
রূপালী এখন কোথায়। এখন সকাল বেলা, দুপুর বেলা, রাত্রিবেলা— এখন সকলবেলা। এ গ্রামের যাদের শরীরে যৌনতা প্রবেশ করেছে তারা রাস্তায় রাস্তায়, বাজারে বাজারে, চিন্তায় চিন্তায় নিরন্তর গতিশীল থাকে রূপালীর শরীরের খোঁজে, শরীরের ছায়ার খোঁজে। তারা সন্দেহের অন্ধকার নিয়ে, সন্দেহের লন্ঠন নিয়ে একা একা রূপালীর সন্ধানে যায়। হরিণগাছী গ্রামের একটা পথ অথচ সে পথ কতো অন্ধকারে যে যায়। এই একটা পথ সকালের দিকে যায় একা একা এবং সকলে মিলে, এই একটা পথ দুপুরের দিকে যায় একা একা এবং সকলে মিলে, এই একটা পথে একা রাত্রির দিকে যায় একা একা একলা একলা। রূপালীকে না দেখতে পেলে সকাল রাত হয়ে যায়, দুপুর রাত হয়ে যায়। এই রাত বেলায় একলা একলা যেতে যেতে তারা একটা মাঠ পায়। মাঠের ভেতর তাদের ঘাম, সে ঘামের ভেতর ধান, গম, আখ এবং আরো নানা শস্যের কোলাহল। শষ্যেরা হুটোপুটি খায়। শস্যেরা সকল সময় মানুষের জন্য আত্মহত্যায় উন্মুখ থাকলে শস্যেরা তাদের শরীর বেয়ে বেয়ে, শরীর খেয়ে খেয়ে উপরে ওঠে, নীচে নামে। মাঠ পার হয়ে গেলে শস্যের পিছনে পড়ে থাকে নিজেদের সীমানায়। শস্যের সীমানা কতোটুকু। যতোটুকু মানুষের জন্য আত্মহত্যা কিংবা মানুষ দ্বারা হত্যা হবার আগে পৃথিবীর আলো-অন্ধকার তাদের শরীরে আসে। সকল সীমানা তবে আলোর রেখায়, অন্ধকারের রেখায়। মাঠ পেরোবার পর আবারো মাঠ। মাঠেরও শখ থাকে আহলাদ থাকে। শস্যকে অতিক্রম করার ক্ষমতা মাঠের থাকলে, মাঠ এ মাঠে সুগন্ধী চাষ করে। ফুল যদি সুগন্ধের উৎস তবে এ মাঠে ফুলের উৎসব, ফুলের সুগন্ধ। সুগন্ধে তাদের সকল শরীর, সকল মন পুলকিত হলে তারা শরীর হারিয়ে ফেলে। শরীর হারানোর ভেতর যে আনন্দ যে উল্লাস তা তারা উপভোগ করতে করতে কতো আকাশ যে পরিভ্রমণ করে কতো আকাশ যে জয় করে তার ইয়ত্তা কোথায়। কতক্ষণ শরীরহীন হয়ে থাকা ভালো লাগে। শরীরের প্রতি সকল মায়া, সকল ভালোবাসা চিরকাল জমা থাকলে তারা শরীরে ফিরে আসে। পার হয়ে যায় সুগন্ধী মাঠ। সুগন্ধী মাঠ পেরিয়ে তারা তখন সবাই একা একা একলা একলা কি ভীষণ ব্যাপক শরীর। শরীরের ভেতর তখন কেবল একটা পথ। এই পথ শাড়ীর মতো হলে তারা তার নাম দেয় শাড়ি পথ। এই শাড়ি পথে তারা এবার যাবে। এই শাড়ি পথে যেতে যেতে নাম দেয় রূপালী শাড়ি পথ। রূপালীর খোঁজে তারা শাড়িপথে হাঁটে, শাড়ি পথে স্বপ্ন দেখে— শারীরিক স্বপ্ন। শারীরিক স্বপ্ন তাদেরকে লন্ডভন্ড করে দেয়। শারীরিক স্বপ্ন তাদের সকল সময়ের ভেতর সকল কাজের ভেতর, সকল চিন্তার ভেতর।
যে গ্রামের নদী শুকিয়ে গেছে— কতো আগে— গল্প জানে, রূপকথা জানে; যে গ্রামের পাহাড় হারিয়ে গেছে— কতো আগে— গল্প জানে, রূপকথা জানে; যে গ্রামের মেঘের টুপি হারিয়ে গেছে— কতো আগে— গল্প জানে, রূপকথা জানে; সে গ্রামে কিভাবে জন্ম হয় রূপালীর তা জানে সে হারানো নদী, হারানো পাহাড়, হারানো মেঘের টুপি। হারানো নদী, পাহাড়, মেঘের টুপি থেকে জন্ম নাকি রূপালীর। না যদি তা, তবে কিভাবে তার রূপে এমন নদী, পাহাড়, মেঘের ঐশ্বর্য। আরো কথা কি দেখো তার রূপের ভেতর নদীর দূরে চলে যাওয়া, পাহাড়ের বিস্ময়, মেঘের দুরন্তপনা। আর রূপালীকে পাবার জন্য হরিণগাছী গ্রামের সবাই হাঁটতে থাকলে, দৌড়াতে থাকলে তার সম্বন্ধে আরো জানতে হয়। তার বাবা পচা মালিথা, যার কান কাটা ছিলো বলে সবাই তাকে ডাকতো কান কাটা পচা মালিথা বলে। কিভাবে তার কান কাটা গেলো সে ব্যাখ্যা একাধিক হলেও সবচেয়ে আকর্ষনীয় ব্যাখ্যাটা সত্য বলে গৃহিত হয়। যে নারীর সংগে তার বিয়ে হয় সে নারীকে সে বিয়ের প্রাক্কালে বিয়ের উপহার হিসাবে একটা কান কেটে দিয়েছিলো। এই কান কেটে উপহার দেয়ায় তার প্রেমের কথা গ্রামের সবার কানে কানে পৌঁছে গিয়েছিলো। সে নারীর আরো দাবী ছিলো তার নামটাও কেটে নতুন নাম রাখতে হবে। বিয়ের সকাল বেলা সে বিয়ের পোশাক পরে সাদা কাগজে লাল কালিতে পুরাতন নামটি লিখে তা কেটে দিয়ে নতুন নাম রাখে রূপচাঁদ মালিথা। নতুন নামে বিয়ে করলেও গ্রামের কেউই তার নতুন নাম গ্রহণ না করলে তার পুরাতন নাম পচা মালিথা রয়ে যায়। বিয়ের পর তার স্ত্রী নিজেই পচা মালিথার নতুন নাম দেয়। তাকে মালি বলে সম্বোধন করে তার স্ত্রী। যেনো তার স্ত্রী নিজেকে ফুল কিংবা ফুলের বাগান এবং নিজ স্বামীকে মালি ভেবেছিলো। তারা দু’জন তবে বাগান ও মালি। বিয়ের ভেতর বাগান ও ফুল আবিষ্কার করতে পারাটা বেশ চমৎকার হলে গ্রামের কেউ কেউ বলে ওদের গৃহে ফুলের সৌরভ আসুক।
রূপালীর যখন জন্ম হলো সে কি তবে ফুল— গন্ধ ছড়ালো পুরো গ্রামে। কেউ কেউ বললো কান কাটা কালো পচা মালিথার কন্যা নয় সে। তবে কার। হরিণগাছী গ্রামবাসীর চিন্তার ভেতর রাত নামলে কে ছিলো অন্ধকার বিছানায় কে জানে। তারপর সকালে আকাশ থেকে আলো আসে, সকালে রূপ আসে, গন্ধ আসে— রূপালী পরিচিত হয় পচা মালিথার মেয়ে পরিচয়ে। তার পরিচয়ের ভেতর গ্রামবাসীরা সন্দেহ প্রবেশ করালেও তার রূপের ভেতর কারো সন্দেহ প্রবেশ করে না। রূপালী বড় হতে থাকলে গ্রামবাসীদের মনে হয় রূপালী মাংশল চুম্বক। তার জন্ম বিষয়ক সন্দেহ তখন এ গ্রাম থেকে হারিয়ে যায়। রূপালী বড় হবার সাথে সাথে আরো কথা এই যে এ গ্রামের পুরুষেরা, নারীরা সকল পুরনো কথা হারিয়ে ফেলে। তাদের সবার মুখে রূপালী ও রূপালী বিষয়ক কথা। তাদের মনে হয় তাদের গ্রামটা আধুনিক হয়েছে। তারা আধুনিক হয়েছে রূপালীর কারণে। তার কারণে গ্রামের সকল পথ পরিচ্ছন্ন হয়েছে, সকল মাঠ যৌবন পেয়েছে, সকল কথার ভেতর কবিতা এসেছে, সকল গানের ভেতর সুর এসেছে, সকল গৃহের দরজায় অভ্যর্থনার আহ্বান উৎকীর্ণ হয়েছে আর তাদের কল্পনায় বৃষ্টির শব্দ অতিথি হয়েছে।
সে যদি ষোলো— তার রূপ উপচে পড়ে দেয়ালের বাইরে, বাড়ির বাইরে। সে যদি ষোলো— তার রূপ উপচে গ্রামের সকল পুরুষ, সকল নারীর শরীরে, মনে। পুরো গ্রাম তার রূপে উন্মাদ হলে পচা মালিথা বোঝে রূপালীর রূপের নিরাপত্তা প্রয়োজন। প্রথমে তা পোশাক। পোশাক যদি নিরাপত্তার আদি উপকরণ হয় তবে বাঘের গর্জন থামুক। পোশাক যদি নিরাপত্তার চিরকালীন উপায় হয় তবে তবুও চিরকাল ভেঙে পড়ে, নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে বাঘের অন্ধকারে। তারপর পচা মালিথা সম্পর্কের ভেতর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেখতে পেলে সে রূপালীর বিয়ের কথা প্রচার করে। বিয়ে দেবার প্রচারে গ্রামের সকল পুরুষ রূপালীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। পচা মালিথা এতো সব প্রস্তাবে ভীষণ সংকটে। জামাই নির্বাচনে কিভাবে যাবে সে। গ্রামের সকল পুরুষ রূপালীকে বিয়ে করতে চাইলে সে অরণ্যের ভয় পায়। যেনো সে তার মেয়েকে নিয়ে অরণ্য পাড়ি দিচ্ছে। অরণ্য পাড়ি দেয়ার কালে সবচেয়ে শক্তিশালী হুংকারের সংগে বিয়ে না দিলে অরণ্য পার হবে কিভাবে। এই জটিলতায় পচা মালিথা দূরে তাকায় গ্রাম ছাড়িয়ে। সেখানেও অরণ্যের ছবি দেখতে পেলে পচা মালিথা তার মেয়ের রূপ নিয়ে এবার হতাশ হয়। কোথায় তার মেয়ের নিরাপত্তা। পচা মালিথা রূপালীর রূপ নিয়ে বিমূঢ়। তখন একটা বৃষ্টি মরুভূমির ভেতর উধাও, একটা বাতাস সমাধির পাশে শায়িত, একটা গান নিরবতার ভেতর আবদ্ধ।
তারপর। অল্পকাল পর দেখা যায়, শোনা যায় রূপালীর বিয়ে হয়েছে দূরের এক দারোগার সংগে। দারোগারা সকল দরজার নিরাপত্তার বিধান দিলে পচা মালিথার মেয়ে রূপালী সম্বোধিত হতে থাকে সাজু দারোগার বৌ হিসাবে। হরিণগাছী গ্রামের সকল পুরুষ শুকিয়ে যায় এই খবর জানার পর। তারা খুব হায় হায় করে এই বলে যে পচা মালিথার গ্রামের প্রতি সামান্যতম ভালোবাসা নাই। না হলে সে কিভাবে পারে গ্রামের অহংকার, গ্রামের গর্ব রূপালীকে গ্রামের বাইরে বিয়ে দিতে। আর এদিকে দেয়ালের ভেতর পচা মালিথা তৃপ্তি পায় যে সে তার মেয়ের ও মেয়ের রূপের নিরাপত্তা বিধান করতে পেরেছে সাজু দারোগার সংগে বিয়ে দিয়ে। নিজেকে পচা মালিথার দূর্গের বাসিন্দা বলে মনে হয় রূপালীর বিয়ে দেবার পর। দূর্গের নিরাপত্তা তার মনের ভেতর স্থায়ী হলে হায় লোকে দেখে তার শরীর দূর্গের বাইরে কেমন অরক্ষিত। একদিন রাত ক্ষয় হলে সকালের ভেতর, বিছানার ভেতর পচা মালিথা লাশ হয়ে কেমন স্থির। তার লাশ দেখতে এসে গ্রামবাসীরা দেখে রূপালীর ক্রন্দনের ভেতর গ্রীক ট্র্যাজেডির শিল্প-সুষমা শ্বাশত। তার ক্রন্দন থেকে যে অশ্রু তা গ্রামের ফুলের বাগানে গিয়ে স্থির গোলাপ।
পচা মালিথার লাশ সমাধিস্থ করার জন্য গ্রামের সকল পুরুষ জড়ো হলে বোঝা হয় রূপালীর ক্রন্দনেরও আকর্ষণ ছিলো। মৃত পচা মালিথাকে স্নান করাতে গিয়ে গ্রামের কেউ কেউ দেখে তার কান দু’টো অক্ষত। কোনো কানই কাটা নাই তার। তবে পচা মালিথার বিয়ের সময় কান কাটা নিয়ে হরিণগাছী গ্রামের সবাই যে গল্প জানে তা মিথ্যে। এবার তারা এই কথা অন্যকে বলে। অন্যরা অন্যকে। গ্রামের কতো সব গল্প যাতায়াত করে গ্রামবাসীর মুখে মুখে তার কতোটুকু সত্য কতোটুকু অসত্য। মানুষের মৃত্যুর আগে মানুষের গল্পের সত্যাসত্য জানবে না তবে কেউ।
পচা মালিথা মারা যাবার পর দেখা যায় রূপালী দূরের শহরে বাস করা সাজু দারোগার কাছে তেমন থাকেনা। সবাই জানতে চেষ্টা করে সাজু দারোগার সংগে তার ছাড়াছাড়ি হয়েছে কি-না। তারা রূপালী বা অন্য কোনো উৎস থেকে জানতে পারেনা রূপালীর সংগে সাজু দারোগার বর্তমান সম্পর্কের কথা। তবে তারা দেখে রূপালী মাসখানেক পর পর সাজু দারোগার শহরে যায়। সেখানে ৭/৮ দিন অবস্থান করার পর গ্রামে ফেরে। সাজু দারোগা যে কিনা রূপালীর রূপের নিরাপত্তারক্ষী তার সংগে রূপালীর দূরত্ব সৃষ্টি হলে হরিণগাছী গ্রামের সকল পুরুষের ভেতর আনন্দ সঞ্চারিত হয়। তাদের মনে হয় কতোকাল পর গ্রামে তারা কোনো সুসংবাদ শুনলো। রূপালীর রূপের নিরাপত্তায় ঘাটতি দেখা দিলে তারা সকল গল্প বাদ দিয়ে রূপালী গল্প ধরে। রূপালীর বাইরে সকল গল্প অশ্রবণযোগ্য, অনুচ্চারণীয়। গল্পের বিষয়ও যে কেবল মাঝে মাঝে গল্পকে আনন্দময় করে তোলে তা তারা অনুভব করে। রূপালী এ গ্রামের শ্রেষ্ঠ গল্প। যে গল্প বলার জন্য এ গ্রামের সকল কণ্ঠের অপেক্ষা হয়েছে, এ গ্রামের সকল শ্রবণের অপেক্ষা হয়েছে, এ গ্রামের ভাষার জন্ম হয়েছে। এ গল্প দীর্ঘজীবি হোক যেমন দীর্ঘজীবি হয়েছে মানুষের জন্ম, মানুষের মৃত্যু। তার মনোহর মুখের, মনোহর শরীরের গল্প ছাড়া এ গ্রামের আনন্দ কোথায়, মুক্তি কোথায়।
রূপালী যদি এভাবে গ্রামে অবস্থান করে তাহলে সমস্যা এই যে তাদের ভেতর কারা কারা যেনো রূপালীর সান্নিধ্য পাচ্ছে। তারা আবিষ্কার করে মাঝে মাঝে এ গ্রামের কারো কারো শরীরে রূপালীর শরীরের সুঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। রূপালীর শরীরের সুঘ্রাণ অন্যের শরীরে রয়েছে জেনে যাদের (অধিকাংশের) শরীরে সে গন্ধ নাই তারা বিষাদ আক্রান্ত হয়, হতাশ হয়। সন্দেহ এ গ্রামের শক্তি হলে গ্রামের পুরুষ ও নারী উভয়ের ভেতর সন্দেহ স্থায়ী আকার নেয়। রূপালীর শরীরের সুবাস যদি কারো কারো শরীরে মেলে তবে রূপালীর সৌন্দর্যের গৌরব আর সবার সাধারণ সম্পদ থাকেনা। যাদের শরীরে রূপালীর শরীরের সুবাস কেবল তারাই তার সৌন্দর্যের গর্বে গর্বিত হয় আর বাদ বাকি সবাই সন্দেহে নিন্দ্রাহীন, ঈর্ষায় আয়তনহীন, অস্তিত্বহীন। নিদ্রাকে ফিরে পাবার জন্য, অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করার জন্য তারা অপেক্ষা করে, চেষ্টা করে কিভাবে তারাও রূপালীর শরীরের সৌরভের অংশীদার হবে।
জলিল মেম্বারকে সবাই প্রথমে সন্দেহ করে যে রূপালীর শরীরের সুবাস তার শরীরে পাওয়া যাচ্ছে। রূপালীর শরীরের কতো কাছাকাছি থাকলে এই গন্ধ জলিল মেম্বারের শরীর পায় এই ভাবনায় তারা তাকে সন্দেহ করে, ঈর্ষা করে, তাকে সুখী ভাবে। গ্রামের মাঠে যে বাতাস বেড়ায়, গাছে যে বাতাস দোল খায়, শরীরে শরীরে যে বাতাস পোশাক উড়ায়— সকল বাতাসে জলিল মেম্বার আর রূপালীর সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বললো কোনো এক অন্ধকারের দরজা দিয়ে রাতের ভেতর জলিল মেম্বারকে রূপালীর বাড়ি থেকে বের হতে দেখেছে। সকল সুবাস সর্বদা স্বল্পস্থায়ী হলে জলিল মেম্বারের শরীর থেকে গ্রামবাসীরা আর রূপালীর শরীরের সুবাস আর পায়না। এই না পাওয়াতে তারা তখন আনন্দিত। কিন্তু আবার এই গন্ধ কি যে রশিদ চেয়ারম্যানের শরীরে রূপালীর শরীরের গন্ধ। এরপর বাতাস ওড়াউড়ি করলে রশিদ চেয়ারম্যানের শরীর থেকে মুছে যায় রূপালীর শরীরের গন্ধ। তারপর দেখি রাজ্জাক ব্যাপারির গায়ে রূপালীর শরীরের গন্ধ। রাজ্জাক ব্যাপারির শরীর থেকে সে গন্ধ মুছে গেলে গ্রামের অন্য কারো শরীরে রূপালীর শরীরের গন্ধ।
বয়সের কারণে গ্রামের যাদের হাঁটা স্তব্ধ হয়েছে তাদের একজন ফরিদ মাস্টারের পর্যবেক্ষণে আসে, যারা পকেটে পর্যাপ্ত টাকা রাখে আর আঙুলে সোনার আংটি পরে কেবল তাদের শরীরেই এক সপ্তাহ মতো রূপালীর শরীরের গন্ধ থাকে। এই পর্যবেক্ষণ গ্রামে ছাড়িয়ে পড়লে গ্রামে এবার টাকা উপার্জনের আর সোনার আংটি বানাবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। সকল পুরুষ, যারা রূপালীর শরীরের গন্ধ নিজেদের শরীরে রাখতে চায় তারা সকাল-সন্ধ্যা ঘাম ঝরালে গ্রামের উন্নতি চোখে পড়ে, অবনতি চোখে পড়ে। টাকা জমানো আর সোনার আংটির কথার পাশে রাতের ভেতর একরাতে মারা যায় চেরুর বৃদ্ধ মা। কে বাড়াবে তার আয়ু যখন তার শরীরে দীর্ঘ দীর্ঘ কালের দূর্গন্ধ। রাতের ভেতর আরেক রাতে কার ভয়ে, কিসের ভয়ে উড়ে যায় সেন্টুর বৃদ্ধ বাবা। কোন গন্ধ বাড়াবে তার আয়ু।
প্রথম প্রথম রূপালীর শরীরের গন্ধের কথা অন্যের নিকট প্রকাশ হয়ে যাওয়াটা লজ্জার বিষয় হলেও এখন তা গৌরবের। বরং এখন এই যে যার শরীরে এখনো রূপালীর শরীরের গন্ধ পাওয়া যায়নি সে অতিশয় অভাবী। তার পকেট নাই, তার সোনার আংটি নাই।
বেকার তরুণেরা এবার বিয়ের সময় শ্বশুরের নিকট থেকে টাকা ও সোনার আংটির দাবী শুরু করলে রূপালী ঢুকে পড়ে গ্রামের প্রতিটি গৃহের শয়নকক্ষে। সকল বিবাহিত পুরুষ তাদের বিছানায় আবিষ্কার করতে চায় রূপালীর শরীরের গন্ধ। কি আশ্চর্য বিবাহের ভেতর যদি রূপালীর শরীরের গন্ধ না থাকে তবে নিজেদেরকে তাদের ভীষণ ব্যর্থ সংসারী বলে মনে হয়। সংসারে যদি রূপালীর গন্ধ না থাকে তবে কেনো সংসার।
এইভাবে কতোদিন যায়। যতোদিনের কথা স্মৃতি থেকে মুছে যায় ততোদিন যায়। রূপালীর বয়স কতো হলো। রূপালীর বয়স পুরুষদের বয়স কাছে গাণিতিক না হলে তার বয়স মনে থাকে না কারো। যারা গ্রামের বৃদ্ধ, যারা গ্রামের তরুণ তারা দেখে রূপালীর বয়স বাড়ছে না। সে যেনো গণিতের বাইরে, শরীরের বাইরে, অথচ কি ভীষণ গাণিতিক কি ভীষণ শারীরিক তার সবকিছু।
তারপর হরিণগাছী গ্রামের অন্যান্য নারীদের কথা স্মরণ করতে হয়। হরিণগাছী গ্রামের নারীরা, যাদের স্বামীরা রূপালীর শরীরের গন্ধের জন্য ব্যাকুল, তারা দেখে তাদের গৃহসমূহের চাবি নাই। এই নিয়ম এই গ্রামের গৃহে গৃহে দীর্ঘ দীর্ঘ কাল চালু যে বিয়ের সময়, বাসরের সময় স্বামীরা কিংবা শ্বাশুড়ীরা বিবাহগৃহের, বাসর গৃহের চাবি স্ত্রীদেরকে উপহার দেয়। চাবি খুঁজে না পেলে এ সকল নারীরা স্মরণে আনতে চায় বিবাহিত জীবনের সকল স্মৃতি। শাড়ির আঁচলের কোণায় কোথাও চাবি বাঁধা ছিলো তা খুঁজে না পেলে, তা স্মরণে না আনতে পারলে গৃহের কোথায় তাদের অবস্থান। চাবিহীন গৃহে তারা কোথায়। তারা এই চিন্তায় যায় চাবি হারানো মানে কি তবে বিবাহ হারানো। তাদের এবার মনে হতে থাকে তারা বিবাহ হারিয়ে ফেলেছে। যদি বিবাহ না থাকে তবে এ সকল পুরুষেরা কারা। কাদের সংগে তারা শরীর উন্মোচন করে, গৃহ উন্মোচন করে, সকল গল্প, সকল ধ্বনি উন্মোচন করে। চাবি ফিরে পেলে তারা কতো কিছু ফিরে পাবে— যখন একা, কুমারী জীবন; যখন প্রার্থিত পুরুষ— শাড়ির ভেতর নদীর স্নান। শরীর যদি এরকম সে কেবল সামনে এগিয়ে যায় তবে তারা ভাবনা রহিত স্থির মাংশের অচল মানচিত্র। এই মানচিত্রের ভেতর মৃত্যুর আভাষ আছে, পরিপূর্ণতা আছে। রূপালীকে এবার তাদের চাবিওয়ালা মনে হয়। যার কাছে এ গ্রামের সকল গৃহের চাবি জমা আছে। যদি তারা গৃহ খুলতে চায়, সে চাবি জমা আছে রূপালীর কাছে; যদি তারা গৃহের জানালা-দরজা খুলতে চায়, সে চাবি জমা আছে রূপালীর কাছে; যদি তারা বিবাহ খুলতে চায়, বাসর খুলতে চায়, সন্তান খুলতে চায়, স্বামী খুলতে চায়, সে সকল চাবি জমা আছে রূপালীর কাছে। যদিও কথা এই, এই গ্রামে নদী নাই, অথচ দেখো রূপালী এ গ্রামের নৌকা। যদি সে নৌকা তার তলায় অদৃশ্য, অচেনা নদী আছে। আর সে নদীর জলপানের জন্য গ্রামের সকল কণ্ঠ প্রসারিত। তারপর হরিণগাছী গ্রামের এ সকল নারীদের দিব্যদৃষ্টির জন্ম হয়— রূপালী জেনেছে এ গ্রামের সকল পুরুষের নগ্নতা, যখন তার হাতে সকল গৃহের চাবি। এই দিব্যদৃষ্টিতে এই দিব্যজ্ঞানে হরিণগাছী গ্রামের নারীরা হারায় নিজেদের সকল শারীরিক ও অশারীরিক অহংকার।
মানুষের শরীর কতোভাবে যে আবিষ্কৃত হয়। যখন নিকটেই ডাক্তার, দেখো সেখানে ব্যাধি পাখির মতো নীড় বেঁধেছে; যখন নিকটেই গণিতবিদ, দেখো সেখানে কেমন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ; যখন নিকটেই কবি, দেখো সেখানে নিস্তব্ধতার অনুবাদ; যখন নিকটেই চিত্রকর, দেখো সেখানে দিনের ভেতর রাত, রাতের ভেতর দিন, কেমন আলো-ছায়া; যখন নিকটেই পরকালবাদী, দেখো সেখানে সূর্যাস্তের বেদনা— আরো আরো কতো কতো মানুষের অনন্ত শারীরিক ভাঁজ— সব খুলবে কে, সব খুলবে কোন জ্ঞান।
হরিণগাছীর সকল পুরুষ আজ সকালে, আজ দুপুরে, আজ রাতে— আজ সকলে আবিষ্কার করে তাদের সবার কান কাটা। এই আবিষ্কার মুহূর্তে পচা মালিথার কথা স্মরণে আসে। তার কান কাটা ছিলো এবং গ্রামবাসীর আবিষ্কার ছিলো মৃত্যুর পর পচা মালিথা তার দু’টো কানই ফিরে পেয়েছিলো। তারা ভাবে মৃত্যু কি মানুষের সকল কিছু ফেরত দেয়, আর তারাও কি তবে মরে গিয়ে তাদের কান ফেরত আনবে।
কবীর রানা। গল্পকার।
জন্ম ১৯৬৮, কুষ্টিয়ায়। ইংরেজি বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় সরকারি কলেজের অধ্যাপক। লেখালেখি করেন লিটলম্যাগে। সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘নিজকল্পা’।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: ‘জল আসে মানুষের দীঘিতে’, ‘মানচিত্রকর’, ‘আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে’, ‘বিড়াল পোষা প্রতিবেশিনীরা’, ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’।
জন্ম ১৯৬৮, কুষ্টিয়ায়। ইংরেজি বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় সরকারি কলেজের অধ্যাপক। লেখালেখি করেন লিটলম্যাগে। সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘নিজকল্পা’।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: ‘জল আসে মানুষের দীঘিতে’, ‘মানচিত্রকর’, ‘আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে’, ‘বিড়াল পোষা প্রতিবেশিনীরা’, ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’।
2 মন্তব্যসমূহ
হুম, একটি গল্প পড়া হল। আর তন্ময় হয়ে বসে থাকলাম কয়েক দণ্ড। ধন্যবাদ গল্পকার। এক নতুন আস্বাদ পেলাম।
উত্তরমুছুনঅন্যরকম লাগলো। ভালো লেগেছে।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের যাবতীয় দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় নেবে না।