TopTime

আজ বঙ্গাব্দ

ডিসক্রিপশনাল সুফী আর্ট নিয়ে পর্যায়ক্রমিক বিবরণ | পর্ব: তিন | শায়লা সিমি নূর


পর্ব: তিন ‘প্রতীকাশ্রয়ী আলো’


আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কিছু জানার চেষ্টা করি যখন, দেখি তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এখন তাদের হাতে আছে একটি নারী রোবর্ট যে আর্টিস্ট। এই রোবর্ট হাই ডেফিনেশন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট করে। প্রযুক্তির দৌড় এক নেশার মতো একে মাদকই বলবো! প্রাকৃতিক জীবন ফেলে ব্যতিক্রমী প্রকল্পের হাতছানি, এবং এখানে প্রচুর পরিমানে আছে অর্থের বিনিয়োগ। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায়  আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো অর্থ-ক্ষমতা। বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন আমাদের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ সাধারণভাবে চিন্তা করলে এ-জগৎ আমাদের অজানা। কিন্তু আমাদের চারপাশের যে জগৎ, যেখানে আমরা বসবাস করি তা নিয়ে আসলে আমরা কতটুকু জানি? বাড়ির পাশে একটি গাছ বা একটি পশু... তার সম্পর্কে কতখানি জানি! এমন পরিবার আছে যেখানে এক সদস্য অন্য সদস্যের খবর রাখে না।

আল্লাহর জ্ঞানের খুব অল্পই আমরা গ্রহণ করেছি। যে যোগাত্মক উপায়ে আল্লাহর জ্ঞান পূর্ণরূপে গ্রহণ করা যায়.... তা ফেলে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিকে বেশি ঝুকে পড়েছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজন আছে ব্যবহারিক জীবনে... তবে প্রাণীকুলের জীবন ও প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়। সাংগঠনিক উপায়ে যে সকল জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা জীবন পদ্ধতিকে সহজ করে নিয়েছি তা আমাদের  উপর আল্লাহর রহমত..।

আজকের চিত্রে প্রতীকী মাজার প্রধান বিষয়। এবং প্রতীক কিছু স্থানে খুব গুরুত্বের  সঙ্গে ব্যবহার করেছি, যখন কোনো নাম কোথাও প্রকাশিত বা নিবন্ধিত হয়..... বিশেষ করে যদি তিনি আল্লাহর সাধক হন, আল্লাহর নৈকট্য পেয়ে থাকেন সে  আত্মার নাম প্রকাশের  ক্ষেত্রে সেখানে আল্লাহর আলো ও রহমত প্রকাশিত হয়। ..... ভৌত রসায়ন যার মাধ্যমে হিসাব পদ্ধতি ব্যবহার করে পদার্থের ভিতরের গঠন সন্মন্ধে জানা যায়! সেরকমই একজন আল্লাহওয়ালার নাম আল্লাহর আলোর প্রতিফলন, কারণ একত্ববাদে সকলেই আল্লাহর নুর আর বিস্তৃত হয়ে আল্লাহর বাণী বাহক।

হজরত আলী’র (রাঃ) দেহকে গোপনে কবর দেওয়া হয় কারণ খারেজী সম্প্রদায়  হয়তো তার দেহ উত্থিত করবে কবর থেকে... সে আশঙ্কায়। এই হত্যাকাণ্ডের পরে উক্ত খারেজী সম্প্রদায়ের চোখে ধুলা দিয়ে ভিন্ন একটি জায়গায়, একটি ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ছদ্মবেশে তার লাশ সাজিয়ে রওনা করে দেওয়া হয়। এবং গোপনে নিকটস্থ সাহাবী ও আত্মীয়দের সমন্বয়ে একটি দল হজরত আলী (আ:) দেহকে কবরস্থ করেন কুফা শহরের রাজপ্রাসাদে... ভিন্ন মতে তার দেহ একটি উটের পিঠে রওনা করে দেওয়া হয় যা আফগানস্থানে এসে হাজির হয়.... আর একটি ভিন্ন মতে উটটি কোথায় চলে যায় কারো জানা নেই, আর একটি ভিন্ন মতে ফেরেস্তারা তার দেহকে আসমানে উত্থিত করে নিয়ে যান....


পেইন্টিং: মওলা আলীর প্রতীকী মাজার/ কাগজে জলরং


৭যিলহজ্জ্ব ৩১৭ হিজরী। বাহরাইনের যালেম শাসক আবু তাহের কারামতী মক্কা মুকাররামায় অতর্কিতভাবে হামলা করে বসলো। হামলার জেরে সে মক্কায় আধিপত্য কায়েম করলো। এবছর মুসলমানদের কেউই বায়তুল্লাহর হজ্জ্ব করতে পারলো না। মিনা-মুযদালিফা ও আরাফার ময়দান ছিলো একদম জনমানবশূন্য। ইসলামী ইতিহাসে পবিত্র হজ্জ্ব বন্ধ হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা।

এই যালেম আবু তাহের কারামাতী... উদ্দেশ্য হাসিল হওয়া মাত্রই স্বদেশে প্রস্থান করলো। যাবার সময় হাজরে আসওয়াদকে বায়তুল্লাহ থেকে বের করে বাহরাইনে নিয়ে গেলো। দীর্ঘ ২২ বছর যাবৎ হজরে আসওয়াদ বাহরাইনেই থাকলো। তারপর আব্বাসী খলীফা মুকতাদির বিল্লাহ ৩৩৯ হিজরী সনে আবু তাহেরের সাথে সমঝোতায় বসেন। ত্রিশ হাজার দীনারের বিনিময়ে হাজরে আসওয়াদকে পুনরায় মক্কা মুআযযামায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত পাশ হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাজরে আসওয়াদ নিয়ে আসার জন্য খলীফা মুকতাদির বিল্লাহ তদানিন্তন সময়ের আরবের সবচে বড় মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল্লাহ (রাহ:)-কে ত্রিশ হাজার দীনার দিয়ে বাহরাইন প্রেরণ করলেন। তিনি এক বিরাট কাফেলা নিয়ে বাহরাইনে গিয়ে হাজির হলেন। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী (রাহ:) বলেন, “শায়খ আব্দুল্লাহ যখন বাহরাইন পৌঁছে গেলেন, তখন হাজরে আসওয়াদ হস্তান্তরের জন্য বাহরাইনের শাসক এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো। যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। বাহরাইনের শাসক এক চমৎকার গিলাফে ঢাকা একটি সুগন্ধিময় পাথর বের করে মক্কার কাফলাকে বললো, এই নিন আপনাদের কাঙ্ক্ষিত হাজরে আসওয়াদ। তাকে সাদরে গ্রহণ করুন এবং খুশিমনে মক্কায় ফিরে যান।” শায়খ আব্দুল্লাহ বললেন, “পাথরটি পরখ বা যাচাই-বাছাই না করা পর্যন্ত আমরা তাকে গ্রহণ করবো না। আমাদের হাজরে আসওয়াদের দু’টি আলামত বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো যদি এই পাথরে পাওয়া যায় তাহলে এটিই আমাদের হাজরে আসওয়াদ বলে প্রমাণিত হবে। আর প্রমাণিত হয়ে গেলেই আমরা তাকে সাদরে গ্রহণ করে মক্কায় ফিরে যাবো।”

বাহরাইনের শাসক জানতে চাইলেন, “পাথরের আলামত দু’টি কী কী?”

শায়খ আব্দুল্লাহ জবাব দিলেন, “প্রথম বৈশিষ্ট হলো, এটি পানিতে ডুবে না। আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হলো এটি আগুনে রাখলে গরম হয় না।”

এবার পরীক্ষার পালা। পাথরটি পানিতে ফেলা হলো। সে তাৎক্ষণিক ডুবে গেলো। প্রথম আলামত পাওয়া গেলো না। তারপর আগুনে রাখা হলো। পাথরটি গরম হয়ে বিকটশব্দে ফেটে গেলো। শায়খ বললেন, “এটি হাজরে আসওয়াদ নয়”।

এরপর আরেকটি পাথর বাহরাইনের শাসক পেশ করলো। তাকেও পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হলো। এটিও পানিতে ডুবে গেল এবং আগুনে গরম হয়ে উঠলো। তখন শায়খ আব্দুল্লাহ বললেন, “আমাদের সাথে আসল হজরে আসওয়াদের ব্যাপারে আপনার চুক্তি হয়েছিল। সুতরাং আমরা আসল পাথর না পাওয়া পর্যন্ত ত্রিশ হাজার দীনার আপনার হাতে হস্তান্তর করবো না।”

অতঃপর আসল হজরে আসওয়াদ নিয়ে আসা হলো। তাকে আগুনে ফেলা হলো, সে গরম হলো না। স্বাভাবিক অবস্থায়ই থাকলো। পানিতে নিক্ষেপ করা হলো। ডুবলো না, ভেসে উঠলো। তখন শায়খ আব্দুল্লাহ (রাহ:) বলে উঠলেন, এটিই আমাদের আসল হাজরে আসওয়াদ। এটিই খানায়ে কাবার অলংকার। এটিই জান্নাতী পাথর। এসময় আবু তাহের কারামতী শায়খকে বললেন, আপনি এসব জানলেন কীভাবে?

তিনি জবাব দিলেন, “এগুলোতো আমাদেরকে রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, হাজরে আসওয়াদ পানিতে ফেললে ডুববে না, আগুনে ফেললে গরম হবে না।”
 
আবু তাহের বললো, সত্যিই তোমাদের ধর্ম অনেক মজবুত, বর্ণনার চেয়েও অনেক শক্তিশালী।

এরপর হজরে আসওয়াদ যখন মুসলমানদের মিলে গেলো তখন একটি দুর্বল উষ্ট্রীর পীঠে সওয়ার করা হলো। কিন্তু হাজরে আসওয়াদের বরকতে দুর্বল উষ্ট্রীটি একদম সবল হয়ে গেলো। তার মাঝে এমন শক্তি আসলো যে, সে বিরতিহীনভাবে কাবার পানে ছুটে চললো এবং অতি দ্রুত হাজরে আসওয়াদকে স্বস্থানে খানায়ে কাবায় পৌঁছে দিলো। অথচ তাকে যখন খানায়ে কাবা থেকে বের করে বাহরাইনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন যে উটেরই পীঠে তাকে রাখা হতো সেটি কিছু দূর যেতে না যেতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো। এভাবে বাহরাইন পৌঁছা পর্যন্ত সেদিন ৪০ টি শক্তিশালী উটের মৃত্যুবরণ হয়েছিল। 


পেইন্টিং: হজরে আসওয়াদ/ ক্যানভাসে জলরং


[মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে ফযল তাবারী মালিকী (রাহ:) প্রণিত ‘তারীখে মক্কা’ নামক গ্রন্থ থেকে অনূদিত]



শায়লা সিমি নূর। সুফী শিল্পী ও কবি। তার কবিতার বই ‘IN THE NAME OF’ গতবছর সার্ক সাউথ এশিয়ান পোয়েট্রি রেকগনিশন করেছে এ-বছর বোডলিয়ান লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এ সংগ্রহ করা হবে। স্বত্বাধিকারী: বেগম রেস্টুরেন্ট এন্ড গ্যালারি, বেগম প্রকাশনা, বেগম এনিম্যাল কেয়ার, রাজুস রিড লাইব্রেরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ