প্যাথোজেনিক প্যানোরমা
সন্ধ্যাঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে লোককথার শেয়াল
এ-কি তার গলতি গন্তব্য? নাকি সুচতুর ফাঁকি?
ধোকা-দগ্ধ মনে কাজিয়া দেওয়া মার্বেলের মতো ছুড়ে মেরে চোখ, রাতকানা-ধ্যানে হেঁটে গেছি স্বর্গমান নিসর্গের দিকে - শরীরের দীর্ঘছায়া পায়ের পশ্চাতে বেঁধে - শৈশবের সুপারি শাখার গাড়ির মতন টেনে টেনে। যেনো কোনো শিশু কদমগুনে শিখে নিচ্ছে মৌলিক সংখ্যা।
ফাঁকা পথের দুপাশে ধূ ধূ নুনক্ষেত ও সবুজ ভাতগাছের মাঠে দাঁড়িয়াবান্দা খেলছে শিশু-হাওয়া - আর আমি ধুলামাখা কাগজে পা পেলে এঁকে যাই ব্যবধান - এইভাবে আরও দু দণ্ড দখিনে দাঙ্গাময় ঢেউয়ের দিকে দীঘল হয়েছে এই মানস ভ্রমণ। যেইখানে এসে নষ্ট ঘড়ির মতন থেমে গেছে বুলভরি আর কাঁটাসংখ্যক পথ। প্রকৃতার্থে পথ, পাথর ও পাথারকে ভয় পায়!
এইখানে বনদস্যুদের বর্ণাঢ্য-দণ্ডন চেয়ে
বৃক্ষ-বন্ধন করছে কিছু বর্ষীয়ান বিটপীর।
এইখানে অনঘ পাখিরা ফেরে পালে পালে,
ডালে উপ-ডালে বসে আখেটক-আবডালে নেয় বিশ্রাম, বিন্যাসে - চঞ্চুর চিমটি করে তুলে আনা খাদ্যকণা প্রেগন্যান্ট প্রেয়সী ও প্রিয়তম ছানাদের
মোহ
চেনা মানুষেরা দূরে সরে গেলে মোহের কি ক্ষয় হয়!
সালমাদের হাসনুহেনার বাগান ছিলো - এক মুনিয়াপাখির বাসা ছিলো ওই উপবনে। পাশেই বয়ে যাওয়া নদীর মতো সরণিতে - অলঙ্ঘ্য আলিঙ্গনের ব্রত নিয়ে ব্রিক-দম্পতি বুনেছে সংসার। সেই পথে যেন বকুল হয়ে ছড়িয়ে ছিলো স্বপ্নালু স্বরলিপি - কুড়াতে কুড়াতে ধীমান যুবক - পথে কাঁটা দেয়া বুড়ির মতো কুঁজো হয়ে গেছে - মোহ এমনই এক চুম্বক মানুষকে মাটিবর্তী করে।
সদরে আজ ভেজা হাওয়া - অন্দরও অার্দ্র - তাই, বুকের কপাট খুলে হৃদয়টাকে ঝুলিয়ে দিয়েছি দূর্যোগ-দিনের পর্দার মত - ধুয়ে মুছে ভিতরটা অমল হয়ে ওঠুক- বাকল বাঁচুক, মানুষ তো লেফাফাদুরুস্তিতেই বাঁচে।
বয়স মূলত বায়স-রঙা ইরেজার - স্মৃতিকক্ষ জুড়ে সন্ধ্যা নামায় তার অন্ধকার। বয়স বাড়লে অন্তর্দৃষ্টিতেও চালিশা পড়ে, দিন নয় রাত নয় স্মৃতিকানাও হয় মানুষ। মক্তবে মুখস্থ করা সুরার মতো ভুলে গেছি আজ, বানমারা মানুষের মত কেন যেতাম ছুটে - ওই-বাগানঘেষা বুকের বাঁপাশে! কে ছিলো সেখানে, সালমা? হাসুনাহেনা? নাকি মুনিয়া?
প্রথমার জন্য ছিলো অবুঝসবুজ ভালোবাসা। বাবার শরীরে মাখানো আতরের সৌরভ ছিলো হেনার। কিন্তু মুনিয়ার মত কেন হঠাৎ হঠাৎ উড়াল দিতে ইচ্ছে করে আমার!
মানুষ তো চায় সমস্ত অক্ষমতার দাগ মুছে নিতে- আমি একটি রেখাও মুছতে পারিনি - পাঁচবছর। চেষ্টায় চেষ্টায় চেষ্টার তেষ্টা বেড়েছে , ঔজ্জ্বল্যও বেড়েছে সেই দাগের।
ব্যক্তিগত বেদনার নীলে নক্ষত্র আঁকতে গিয়ে মনে হল, ফারাহ্ রাজা নীলনদে ডুবে মরার আগে আকাশ কি নীল ছিলো! ভাবতেই উড়ে গেছে অঙ্কিত নক্ষত্র - বিষাদে বিষাক্ত আকাশে, সৌরশূন্যে। যার রঙ দিতে পারিনি। আয়ুর রঙ কি সোনালী? আয়ুর শ্বাস নিংড়ে তাকে তুলে দেব শরাবনতহুরা!
এ-বেলার নাম করে সে-বেলার গল্প
ভিতরে চিক্কুর দিয়া ওঠে এক ভিনদেশী পাখি
হঠাৎ হঠাৎ। কোথা সেই চাবি, খুলে দিব দ্বার!
কেঁদো না কেঁদো না ওগো দলমেলা আঁখি
বাহিরে রোরুদ্যমান রোদ, ঝলমলে অন্ধকার!
আদিজন্মে ছিলেম বিহগ, সাকিন বলো তোমার
অন্ধ-পক্ষপাতের এই দুষ্টগ্রহে নিয়েছি শামুকের ভান
ভুলে গেছি গুটিয়ে যেতে যেতে, উড়ালের সহজিয়া গ্রামার
সাবাড় হয়ে যাওয়া বাদাড়ে, আছে পড়ে সে-বেলার কুহুতান
কতোবার ওই ভুখাচাঁদ আমার স্তন পিয়ে হয়েছে গোলগাল
এখন তার সাথে কাহার ভাব! জানো কিছু অন্তর্গতা?
আহা! সেসব দিনের সাক্ষী শুধু মেঘের প্রবাল
কতোদিন পাদপ ও পবনের সাথেও হয় না কথা
বিজন বনের রাখালিয়া সুর শুনতে কেমন, ভুলে গেছি ক্রমে
ঘাঁড়ের ভাঁজে সেদিনের ধুলো আজও আছে জমে
দেখো, স্মৃতির আর্দ্রতা ধরে সমুদ্র হয়ে ওঠছে চোখ
বাকি উন্মেষের অসন্তোষ নেই, মানুষজন্মের জন্য শোক
মানুষ তো সতত আপনা বিশ্বে সর্বস্ব মাতাল
মানুষ তো সতত খনন করে নিজস্ব পাতাল।।
চিঠি
(নাজমা-কে)
অযত্নে পড়ে থাকা কাপড়ে থানের দাগের মতো কিছু অবেহলার চিহ্ন লেপ্টে ছিলো পানপাতা-হৃদয়ে - বিদিত বেদনার ঘামে ভিজে এই দুর্মোচ্য দাগ বসতি গেড়েছিল একদিন - তুমি এসে, রোজ ফ্লোর মুছার মতো করে ক্লিশে হৃদয়টাকে রাঙিয়ে দিলে ভালবাসার বিশুদ্ধ বার্ণিশে - স্লেটের কোণে না-মুছা খড়িচূর্ণের মতো মেঘ জমে ছিলো হিয়ার ঈষাণে - তুমি বিজ্ঞ কিষানী সেজে ক্ষেতে ঢুকে পড়া গরুর মতো প্রতিসংহার করলে সেইমেঘ।
এখন আমাদের আকাশ নীল। অগণন গগনচারীতে মুখর। ভিতর-ব্যোমে কিছু সামার ট্যারাজানও পুষি। এখনও তুমুল তৃষায় সমুদ্র ভেবে যেখানে ডুব দেই, সে তোমার ঠোঁট। ফিদা হোসেনের চিত্র চুরি করা প্রজাপতির ডানা মতো আলতো করে যখন তোমাকে ছুঁয়ে দেই - একঝাঁক ফড়িং উড়ে নাগালে নাগালে। আমরা স্বপ্নের পিছুপিছু ছুটি। এভাবে যেতে যেতে চেতনে, অচেতনে বা অবচেতনে কখনো যদি মন খারাপ বিঁধে যায় ভিতরে - ভাঢিয়ার মতো যত্ন করে তুলে ফেলে দিও...
ইয়ার ইগনিয়াস। কবি।
জন্ম কক্সবাজারে।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: 'হারমিসের বাঁশি' (২০১৯)।
জন্ম কক্সবাজারে।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: 'হারমিসের বাঁশি' (২০১৯)।
1 মন্তব্যসমূহ
সুন্দর! অসাধারণ!! দারুণ লাগল।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের যাবতীয় দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় নেবে না।