TopTime

আজ ২৩ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার | আর কে রোডের সাথে সাজ্জাদ সাঈফ

 সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি সাজ্জাদ সাঈফের ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘দ্রাঘিমালন্ঠন’। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, সাহিত্য-রাজনীতি, সামগ্রিক লেখকজীবন ইত্যাদি বিষয়ে বাছাইকৃত সাক্ষাৎকার সিরিজের প্রথম পর্বে আর কে রোডের সাথে আলাপচারিতায় কবি সাজ্জাদ সাঈফ।

আর কে রোড: আপনার ষষ্ঠ কাব্য ‘দ্রাঘিমালন্ঠন’ প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর এই বইটি প্রকাশিত হওয়াতে কি প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ করার মতো আনন্দ পাচ্ছেন?

সাজ্জাদ সাঈফ: সর্বশেষ ২০২০ সনে ৫ম গ্রন্থ প্রেমপত্রের মেঘ প্রকাশের পর, 'রাজার কাছে কবির চিঠি' প্রকাশের উদ্যোগ নিলে দেখলাম প্রকাশকরা সেই বইটি প্রকাশে যথেষ্ট সাহসী নন বিধায় করতে চাননি মূলতঃ আওয়ামী রেজিমের গুড বুক হতে বিচ্ছিন্ন হবার ভয়ে, তখন নিজেকে আরো একা করে শুরু করি দ্রাঘিমালন্ঠন সিরিজের কাজ, সময়টা ২০২১, ২০২৩ এ প্রাক্তন প্রকাশককে যখন পাণ্ডুলিপি দিলাম তিনি মেইলে জানালেন তার কোনো জুরি সদস্য বইটি প্রকাশে ভেটো দিয়েছে, প্রচণ্ড আঘাত পেলাম, বুঝলাম আওয়ামী রেজিমের লেখক সে জুরি হোক বা প্রকাশক হোক সাজ্জাদ সাঈফকে কোনঠাসা করতে বদ্ধপরিকর, নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে সিরিজটি নিয়ে আরো আরো কাজ করতে থাকলাম, সে বছরই দ্বিমত পাবলিশার্স বইটি প্রকাশে এগিয়ে আসার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিল তাতে আমি কৃতজ্ঞ যদিও প্রেস অব্দি যাবার পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ডামাডোলে সময়োপযোগী আরো কাজ করবার সুযোগ বুঝতে পেরে প্রেস থেকে বইটা উইথড্র করে আরো বিস্তৃত পড়াশুনা আর পরিস্থিতি অনুযায়ী আরো আরো পরিমার্জনের মধ্যেই ৩৬শে জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়লে ব্যক্তিজীবন প্রায় তছনছ করে দেয় আওয়ামী রেজিমের পুলিশ ও নেতাগোছের কিছু হুমকিধামকি, সব কিছুই কবিতায় ধারণ করেছি, জুলাই পরবর্তীকালে বইমেলাকেন্দ্রিক টাইমিং না হবার অছিলায় দ্বিমত বইটা না করায় পাশে দাঁড়ায় দেশ পাবলিকেশন্স, ২০২১-২০২৫ বহুল পাঠ পরিক্রমার স্বাক্ষী এই বইটি আসাতে নিজেকে একজন যুদ্ধজয়ী কবিতাকর্মী হিসেবে ভাবতে পারতেছি। যে অনুভূতি আগের সব অনুভূতির উর্দ্ধে।

আর কে রোড: অর্থাৎ, দ্রাঘিমালন্ঠন বইয়ের কবিতাগুলো ‘রাজার কাছে কবির চিঠি’-এর পরবর্তীতে লেখা।

সাজ্জাদ সাঈফ: হ্যাঁ অনেক পরের লেখা যদিও সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজার কাছে কবির চিঠিও দুই পর্বে বিভক্ত মানে ১. সাবেক রাজা(প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনাকে লিখিত পত্রাবলী, ২. বর্তমান রাষ্টপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে লিখিত পত্রাবলী, এই আরকি...

আর কে রোড: দ্রাঘিমালন্ঠনের কবিতাগুলোতেও কি রাজনৈতিক কোনো উপাদান রয়েছে?

সাজ্জাদ সাঈফ: রাজনীতি কিসে নাই আসলে, আবুল হাসান এটি নিয়ে দুর্দান্ত কবিতা লিখেছিলেন। দ্রাঘিমালণ্ঠন সিরিজটি প্রথমত ২০২১ সালে শুরু হয় কবিতাযাপনের জন্য আত্মনির্জনতা ও আত্মউদযাপনের মর্ম তুলে ধরতে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, নান্দনিক উপস্থাপনার নিমিত্তে। তবে ধীরে ধীরে জাতিসত্তার অংশ হিসেবে একজন কবিকে জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যেহেতু পরিস্কার অবস্থান নিতেই হয় সেহেতু নাগরিক হিসেবে দ্রাঘিমালন্ঠন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আবহকে আত্তীকরণের মাধ্যমে সমাপ্তির দিকে এগিয়েছে চার বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতিকালে।

আর কে রোড: কবির নাগরিক দায়বদ্ধতার মতো কবিতারও কোনো দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে করেন?

সাজ্জাদ সাঈফ: কবির দায়বদ্ধতা সম্পর্কে কবিতার দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ইতিমধ্যে পৃথিবীতে অসংখ্য কথাবার্তা হয়ে গেছে। কবিতার আসলে সে অর্থে দায়বদ্ধতার জায়গাটা আপেক্ষিক, নেরুদা বা হুইটম্যান বা নজরুল সুকান্ত নাজিম হিকমত তাদের সময়ে জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে কবিতাকে ব্রক্ষ্মাস্ত্রে পরিণত করেছিলেন, আবার রাজকবি আলাওলকে দেখতে পাব সময়বিশেষে ভিন্ন দায়বদ্ধতায় লিখতে। আল মাহমুদের ক্ষেত্রে এই দায়বদ্ধতা যেমন আলাদা, তোমার ক্ষেত্রেও ভিন্ন। এই দায়বদ্ধতা নির্ভর করে কবির উপলব্ধির ওপর। আবার স্রেফ শিল্পবোধের দিক থেকে দেখলে কবিতা কোনো বিষয় বা ইস্যুতে দায়বদ্ধ নয়।

আর কে রোড: দ্রাঘিমালন্ঠন বইয়ের কবিতাগুলো পড়েছি। আপনার পূর্ববর্তী বইগুলো থেকে ভিন্নরকম মনে হয়েছে।

সাজ্জাদ সাঈফ: তোমার পর্যবেক্ষণ ঠিক। আসলে এ পর্যন্ত করা ছয়টি বইয়ের কবিতাগুলিতে একটা আরেকটা হতে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সচেতন চেষ্টা করেছি বরাবরই। জেনেটিক্যালি ক্রিকেটে আমি একজন স্পিনার, একজন এক্সপেরিমেন্ট সচেতন স্পিনারের ছয়টি বল একই বোলারের হাত হতে এলেও ছয় রকম ডেলিভারি হবার যে প্রচেষ্টা ঠিক তেমন। মোটাদাগে একই বক্তব্যরীতিতে লিখনিকে আবদ্ধ না রাখার নীরিক্ষা বললে উপযুক্ত শোনাবে।

যেমন চার বছর আত্মনিমজ্জিত চর্চায় লিখিত দ্রাঘিমালন্ঠন বই হবার সাথে সাথে শুরু করা নতুন পাণ্ডুলিপি 'মসনবি ফুল' বা আরো আগে শুরু করা 'আমি মুহাম্মাদের (সাঃ) লোক'র কবিতাগুলি আবার দ্রাঘিমালন্ঠন হতে ভিন্ন পাবে...

আর কে রোড: এক পাণ্ডুলিপি থেকে অন্য পাণ্ডুলিপির যে ভিন্নতা, এর মধ্যে নিজস্ব সিগনেচার বজায় রাজায় ব্যাপারে আপনি সচেষ্ট কি না.....

সাজ্জাদ সাঈফ: এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পাঠকের  কাছেই পাওয়া যাবে। লেখায় নিজ সিগনেচার প্রতিটি লেখকের আত্মার বহিঃপ্রকাশ, তুমি তোমার শরীরকে যত সজ্জাই দাও না কেন তোমার আত্মা অবিকল থাকবে যদি তুমি নিজে আত্মার প্রতি যত্মবান হও আর এর জন্য একটা পর্যায়ে গিয়ে চেষ্টার প্রয়োজন হয় না কেননা লেখক সত্তা অবচেতনেই এই প্রচেষ্টা বহন করে থাকে।

আর আমি ইলিয়াসের ঘরের পোলা,
চিলেকোঠা পাহারা দিই বাংলা কবিতার

আর কে রোড: কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা করেন কি না?

সাজ্জাদ সাঈফ: দেখো, তুমি একজন কবি, এই প্রজন্মের লেজুড়বৃত্তিবোধ বহির্ভূত একজন অটল কবি, তুমি যখন চারপাশে লেজুড়বৃত্তিক সিন্ডিকেটের আধিপত্য দেখবা বছরকে বছর তখন সেই সিন্ডিকেট গং এর সাথে নিশ্চয়ই আপোষ করবা না, ২২-২৩ বছরের লেখক জীবনে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যের ঠিক একই পরিবেশে আমি আমার অনেক বন্ধু অনুজ ইভেন অগ্রজকে দেখেছি সাত্ত্বিক  অবস্থান জলাঞ্জলি দিয়ে এক পর্যায়ে সিন্ডিকেটে আপোষ করতে স্রেফ পুরস্কার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এসব প্রাপ্তিকে কি তুমি বা পরপ্রজন্ম বৈধ বলবে? আমি আমার চলপ্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের জন্য আল মাহমুদ যিনি খোদ শামসুর রহমানের আগে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েও এইমাত্র মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন ও বদরুদ্দীন উমরের যিনি প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার মেরুদণ্ডধারী তাদের উদাহরণকে প্রামাণ্য করতে আগ্রহী, কোনো অনৈতিক সাহিত্য পরিবেশকে মেনে নিয়ে কোনো পুরস্কার প্রত্যাশা আমি কখনোই করি নাই বিধায় এখন অব্দি আমি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেট গোষ্ঠীগুলির বহু প্রলোভনেও সমঝোতায় না যেয়ে তুমুল অখ্যাতিকেই বরং এনজয় করে যাচ্ছি বলে এখনো লেখায় বলায় চলায় একক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং দ্রাঘিমালন্ঠনেও স্পষ্ট দেখবে এই কথাগুলি অবলীলায়  এসেছে, এরপরও কবিতা নিয়েই যাপনকে যে কোনো মোহ হতে দূরেই রাখব। অবাক হবার কিছুই নাই যদি কেউ কেউ বলে এই কবি যত গর্জে তত বর্ষে না বলেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার তার নাই, এই যে 'নাই' এর ভিতর কি 'আছে’ তার অস্তিত্ব আমি কবিতায় কতখানি রেখে আসছি তা কবির আত্মবিশ্বাস হতে আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারব।

এবং সিস্টেমের ৭১ পরবর্তী গণ আকাঙ্ক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না পেয়ে অন্যান্য পুরস্কারের মত বদরুদ্দীন উমর এবারেও পুরস্কার বর্জন করেছেন, এই হইলো প্রকৃত আপোষহীন বুদ্ধিজীবীর চরিত্র, আমরা এও দেখেছি জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করবার পর এর যাবতীয় সুবিধাদি গ্রহণ শেষেও কেউ কেউ পুরস্কার বর্জন করে ভাইরাল হয় তো এইসব রাজনৈতিক দূষণপূর্ণ পুরস্কারকে একজন কবি হিসেবে তুমি নিজে কিভাবে জাস্টিফাই করবা তাইলে?

আর কে রোড: আপনি নতুন বইয়ে বলেছেন 'আর আমি ইলিয়াসের ঘরের পোলা, চিলেকোঠা পাহারা দিই বাংলা কবিতার'... এরকম স্টেটমেন্ট একটা দুঃসাহস বা ঝুঁকি নেয়াকে চিহ্নিত করে, এখানে আপনি কি বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চেয়েছেন?

সাজ্জাদ সাঈফ: মেডিকেল কলেজ জীবনের ১ম বর্ষ হতেই লাগামহীনভাবে আউট বুক পড়ার অভ্যাস আমাকে সৃজনশীল লেখালেখিতে সার্বক্ষণিক মোহে আটকে ফেলে, সে সময় বগুড়ার সমস্ত লেখক সার্কেল হয়ে লেখক চক্রে থিতু হই এবং শুরুর দিনগুলিতে বগুড়া চষে বেড়াতে গিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শামীম কবীরের ভিটাবাড়ি কয়েক দফা ঘুরে ফিরি, যখন বুঝলাম বগুড়ার আধিপত্যবাদী সাহিত্যজীবি গোষ্ঠী তাদেরই ভূমিসন্তান ইলিয়াস, শামীমের জাতীয় ইভেন সর্বকালীন ইমেজ স্বেচ্ছায় ওউন করে না তখন অলরেডি আমি চিকিৎসক হয়েছি অথচ বিশেষত ইলিয়াসের নিজ ভূমে অপূর্ণ মূল্যায়ন আমাকে পীড়িত করত সব সময়ই, এক সময় ঢাকার নিজ ভূমি থেকে এক প্রকার স্বেচ্ছানির্বাসনে বগুড়ায় ফিরে এসে চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি পাকাপাকিভাবে লেখালেখির জগতে বিচরণ করি তবে এখানকার ঘৃণ্য সাহিত্যপরিবেশকে নয় ইলিয়াসকে সত্তায় ধারণ করে যিনি সারা বিশ্বে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিকে সাবলীল করে গেছেন। আর সুদীর্ঘ নির্বাসিত পরবাসী জীবনে এখন ইলিয়াস বা শামীম কবীরের মৌলিক সাহিত্যের ধারা বয়ে নিবার তাগিদে এক সময় টের পাই এই মাটি ও মানুষের মাঝে নিজেকে বিরাজিত রেখে কবে যে অবচেতনে আমিও হয়ে গেছি ইলিয়াসের ভূমিসন্তান যে এই লোকালিটির ভাষায় কথা বলে, লেখে, চিন্তা করে সর্বোপরি ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই হয়ে বাংলা কবিতার প্রতিনিধিত্ব করছে...

আর কে রোড: জুলাই বিপ্লবে আপনাকেও ব্যপকভাবে সক্রিয় থাকতে দেখেছি, বিভিন্ন হুমকি পেয়েছেন, একজন লেখক হিসেবে এক্ষেত্রে আপনার অবস্থান যদি বলা যায়...

সাজ্জাদ সাঈফ: আবারো বলি তুমি একজন কবি, জুলাইয়ের গণহত্যা তুমিও এড়িয়ে না গিয়ে সমগ্র জাতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলে, কেন নিয়েছিলে? এর উত্তরই আমার উত্তর। আর দীর্ঘ পরিচিতির সুবাদে তোমাকেই একটা প্রশ্ন করি তুমি কি সমকালীন আর কোনো কবিকে বিগত পতিত ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যুগব্যাপী অটল প্রতিবাদ করে আসছে এমন দেখেছো?


আর তোমার কবরে বিলাসিতাও স্পষ্ট, শুধু সমাধিফলকে লিখে গেছে কারা- 'এই লোক কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি, মস্ত ফেরেব্বাজ ছিলো'!
—দ্রাঘিমালন্ঠন

আর কে রোড: বিচ্ছিন্ন দুয়েকজন মাঝেমধ্যে কথা বলেছে কিন্তু জুলাইয়ের আগে অব্দি বিগত ১৬ বছর টানা মারকাটারি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জারি রেখেছেন এমন কারো কথা মনে পড়ছে না।

সাজ্জাদ সাঈফ: ঘটনাটি এখানেই আসলে, আমাদের মিডিয়ামুঘল লেখক কবিগণ গত ১৬ বছর বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করে নাই, বিচ্ছিন্ন দুয়েক ঘটনায় প্রতিবাদ করেছে এত বছরে অন্যরা কেউ কেউ, কিন্তু কবি হিসেবে বা একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে তুমি জানো যে কোনো মিডিয়া বা সরকারি আনুকুল্য বা বিরাগভাজন হবার তোয়াক্কা না করে সাগর রুনি হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ত্বকীসহ নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, তনুর ধর্ষণ, বিশ্বজিৎ, আবরারের রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা সব ইস্যুতেই আমার কবিতা কথা বলে এসেছে, সেক্ষেত্রে স্বাচিপে আমার নাম থাকলেও চিকিৎসক  নেতারা কোনোদিনই আমার খোঁজ খবর রাখে নাই এইজন্য যে তারা জানতো আমি তাদের মত দলান্ধ না হয়ে বরং শেখ হাসিনার রক্তপিপাসাকে ঘৃণা করতাম এবং সমস্ত আওয়ামী প্রোগ্রামকে স্পষ্ট 'না' বলতাম, মানে জুলাইয়ে অনেকের মত আমি হঠাৎই দেশপ্রেমিক হয়ে যাই নাই, তুমি জানো যে ফ্যাসিবাদ বিরোধী কবিতার আয়োজন যখন শুরু হয় তারও অনেক আগে থেকেই 'মায়ার মলাট'র কবিতাগুলি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করে এসেছি, এরপর জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়তা এবং নিজ উদ্যোগে 'জাতীয় ফ্যাসিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মঞ্চ' প্রতিষ্ঠা করে লেখকদেরকে বিভিন্নভাবে সোচ্চার করতে চেষ্টা চালিয়ে গেছি ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন/পুনরুত্থান ও সাম্প্রদায়িক উগ্রতার বিরুদ্ধে অবস্থান বিষয়ে। দুর্ভাগ্য এই যে জুলাই নিয়ে বেশিরভাগ লেখককেই ক্রেডিটসুলভ সভা সেমিনারে ব্যস্ত দেখলেও কাউকেই দূরদর্শী পদক্ষেপে রাজী করাতে পারি নাই যারপরনাই দেশে এতসব বিশৃঙ্খলা এড়ানো যাচ্ছে না আর, অথচ ৫ই আগস্টের পরপরই আমার আনীত প্রস্তাবনাগুলি নিয়ে লেখক সমাজ কাজ করলে এতদিনে রাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতো, সবাই ইউনুস সরকারকে দায় দিয়েই দায় সারছেন কিন্তু এইটা বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন ড. ইউনুস দায়িত্ব না নিলে পতিত ফ্যাসিস্ট ও তাদের অভিভাবক মোদী সরকার জুডিশিয়াল ক্যুতেই সফল হয়ে গিয়ে বাংলাদেশকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত এতদিনে।

আর কে রোড: আবার কবিতায় ফিরি, কবিতার এমন কোনো নির্ণায়ক আছে কি যা দিয়ে কবিতাকে সমকালীন আখ্যা দেয়া যায়?

সাজ্জাদ সাঈফ: হ্যাঁ অনেকরকম নির্ণায়ক আছে, তরতাজা উদাহরণ বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন ও মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের অনৈক্য, এছাড়া রাশিয়া ইউক্রেন বা মিয়ানমারের জাতিযুদ্ধ, এসব পার্সপেক্টিভে মানবতার ওপর আঘাতের পর আঘাত, বাজারে প্রভাব, তারুণ্যের অবসাদ, অবক্ষয়, এসবের একদমই বাহিরে থেকে যদি কেউ আত্মকেন্দ্রিক নস্টালজিয়া বা আত্মপ্রসাদে ভরপুর কবিতা চালিয়ে যান তার অবস্থা ওই মুমিনের মত ঈশ্বর পুরো বিপথগামী  জাতিকে ধ্বংস করতে নির্দেশ দিবার পর জিব্রিল আঃ জানালেন অমুক পরহেজগার অমুক আত্মগোপনে ইবাদতে মশগুল যার প্রত্যুত্তরে ঈশ্বর বললেন তাকে সহ ধ্বংস করো কেননা তার এবাদত দিয়ে সে তার জাতিকে পবিত্র এবাদতে শামিলের চেষ্টাটা করে নাই। এই তো গেল ভূ রাজনৈতিক নির্ণায়ক, সমকালীন জাতীয় আন্তর্জাতিক যে কোনো প্রাজ্ঞ দর্শনকে ধারণের মুন্সিয়ানাও একজন সার্থক কবির সমকালীন সত্তাকে চিহ্নিত করে থাকে।

আর কে রোড: কবিতায় আপনাকে সবচেয়ে মনোযোগ দিতে দেখা যায় সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি বা রাজনীতির সাথে ইতিহাসের কোনো না কোনো এলিমেন্টকে কানেক্ট করতে, এইটা আমার মনে হয় না সাদাসিধা কাজ, যেহেতু অধ্যয়ন আর গ্লোবাল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকার একটা বিষয় থাকে, আরো দেখা যায় আপনার পছন্দের নিভৃতিচারণকে কখনো স্নেহের সাথে ফিলোসোফিক্যাল ইকোর মতন প্রশ্নে জর্জর করছেন আবার কখনো তিরস্কার করছেন, যেমন দ্রাঘিমালন্ঠনের প্রথম গদ্য কবিতাটি—

'চারদিকে ফসল ডোবানো শব্দে বৃষ্টি হচ্ছে, হয়তো কোথাও যাবার প্রস্তুতি নিয়ে থমকে রয়েছে কেউ, এভাবেই একদিন মহেঞ্জোদারো থেকে হারিয়ে গিয়েছে তার কূপগুলি, হরপ্পায় চুপ করে গেছে দ্রাবিড় নিনাদ, আর এখানে সোনারগাঁও চেয়ে আছে ঈশা খাঁর বজ্রচাহনী ছুঁড়ে ব্রক্ষ্মাণ্ড্রে, এভাবেই একদিন পৃথিবীর শেষ ঘাসেরা মাঠে মাঠে সমুজ্জ্বল হবে তোমার সামনে।

এতকিছু উপচে এসে বৃষ্টি লাগছে গায়ে। তুমি নির্বিকার। যেন হৃদয়হীনের বধিরতা নিয়ে বুকের ভিতর কথা চালাচালি করছে অতীত। 

কতদূর এগিয়ে গেলে যাত্রাপথেরা পায় কবিতার মর্যাদা, আর থাকে মানচিত্রের বিক্ষত দাগ, সবুজ তামাদি হবার গল্প। এতখানি নিঃসঙ্গতা হতে স্বপ্নেরা মাথা উঁচু রাখে তাই মনে হয় কিছু তো বলার কথা ছিল তোমারই, তুমি সেই ভূমিসন্তান, তবে কেন তুমি নাই শ্লোগানের মঞ্চে, নাই বিধানে কোনো!

এমনতর নীরবতা কি ধ্যানের শামিল নাকি দৃঢ় কোনো প্রতিজ্ঞার প্রস্তুতি?'

অথবা

'এতসব নিরাময়অযোগ্য বাক্যব্যাধীর দরুন শুকিয়ে যাচ্ছে ফোরাত, বিশ্ব নির্বিকার, ভরপেট খেয়ে চুপ করে আছে জাতিসংঘ।

এ সময় নির্লিপ্তি, একা হয়ে বসে থাকা যায়? বসে বসে মানচিত্রের বিক্ষতদাগ কই, কোন পথে গিয়ে কোন মরুকান্নায় বিজড়িত আজ, লিখে দেয়া যায় নাকি স্নায়ুদ্রাঘিমায়?

আমাকে নিশ্চল হতে হয় নিজের সামনে বসে, যেন-বা হাত নাই, মুখ নাই, চোখ নাই আর ডান হাতে একটা কলম, টেবিলে কাগজ বাদে সবকিছু উধাও কোথাও!'

অথবা

'যেন গাঙ বেয়ে আসে খুরধ্বনি, করতালি, পানাম নগরী ধেয়ে, যেন অন্তেষ্টিক্রিয়া সেরে এসে ফ্যাসিবিরোধী মিছিলে নিহত কন্যার ছবিতে হাত বুলাচ্ছে কেউ; ফ্যাসিস্ট পতনের সেই ফুলচন্দন দৃশ্যের পর কেন এখানে মবের তাড়া আজ, প্রশ্নবিদ্ধ এক সংবিধান নিয়ে উসখুস করে বাংলার ফুসফুস?

কবিতা এখন মৌলিক অধিকার, গেরিলার পাইপগান যাকে ভুলে গেছি আমরা, আজ ভুলে যাব মিসাইল এটাক গতকালকের; রক্তবর্ণ গাজার অদূরে জলপাইঘন গল্পে ঘুমায় প্রাচীন ফিলিস্তিন, অন্তর জুড়ে তার আকসা-মিনার!'

কবিতায় এই ঘরানার কাজ বিগত দুই বা আড়াই দশকে আসলেই বাংলায় আর কেউ করেছেন এমন স্পষ্ট উদাহরণ নেই, আপনি কি একে আপনার কবিতাচর্চার বিশেষত্ব বলবেন?

সাজ্জাদ সাঈফ: তুমি তো প্রশ্নের ভিতরই সব বলে ফেলছো, এই প্রশ্নের উত্তর আসলে আমি বরাবরই স্কিপ করার পক্ষে, এর উত্তর আমি কবিতাতেই দিতে চাই সব সময়।

আর কে রোড: আপনার টেক্সটের শুরুটা 'কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা ' কাব্যগ্রন্থ দিয়ে, এরপর 'মায়ার মলাট', 'ভাষার সি-বিচে', 'বহুদিন ব্যাকফুটে এসে' এবং 'প্রেমপত্রের মেঘ' সর্বত্রই আপনার রাজনৈতিক কবিতার শব্দনির্মাণ, শব্দনির্বাচন, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, পয়ার, মুক্তছন্দ, গদ্য কবিতার একটা যোগসূত্র আমরা খেয়াল করে দেখেছি এবং আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে আপনার কবিতার ভাষা সমকালীন বাঙালি কবিদের ভিতর সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বর বহন করে আসছে, তো ভূ-রাজনৈতিক কবিতার ক্ষেত্রে আপনার ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক পড়াশোনার ব্যপকতা চোখে পড়ার মতন একটা অবস্থান ইতিমধ্যে তৈরি করেছে, প্রথম বই হতে শুরু করেছেন যীশুর পার্সপেক্টিভে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিপীড়িত বাস্তবতাকে কিছুটা স্যাটায়ার কিছুটা ফিলোসোফিকাল জার্নিতে অবগাহন করিয়ে পর্যায়ক্রমে পরের বইগুলিতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কোথাও মনোটনি না ঘটিয়েই, দ্রাঘিমালন্ঠনেও ফিলিস্তিন ইয়েমেন নিয়ে আপনার সুস্পষ্ট অবস্থান আমরা লক্ষ্য করলাম, এক্ষেত্রে আপনি কি বিশেষ কোনো বার্তা বা বয়ানকে সন্নিবেশিত করতে এগিয়ে চলেছেন?

সাজ্জাদ সাঈফ: যীশুর প্রতিনিধিত্ব করতে আসলে নিজের চিকিৎসক পরিচয়কে সামনে রেখেছিলাম এই বলে যে 'কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা, জনপদের সকল অসুখ', সেজন্য কথা ঘুরেফিরে একটাই যীশুকে/ঈসা আঃকে যে কারণে যন্ত্রণা সইতে হয়েছে মানে সত্য অসত্যের লড়াই মানে ধর্ম অধর্মের লড়াইয়ে কবির প্রতিনিধিত্বকে ফোকাস করে আমার কবিপ্রকাশ শুরু এবং এই প্রতিনিধিত্ব চিরদিনের মানে পরবর্তী বইগুলিতেও ধারাবাহিক  জায়োনিস্ট অসত্যের বিপক্ষে স্ট্যান্ড বজায় রেখেই এগিয়ে গিয়েছে আমার বইগুলার যাত্রাপথ, বার্তা স্পষ্ট যে এই সভ্যতা ধীরে ধীরে যে জাজমেন্ট ডে বা বিচার দিবসের দিকে ধাবমান সেই সভ্যতার মানবিকতার প্রশ্নে কবিতার অবস্থান থাকবে ঈসা আঃ(যীশু) অনুগামী যা পবিত্র কোরান স্পষ্ট করেছে।

এসব সত্যোচ্চারণের মতই অমোঘ নিয়মে 'দ্রাঘিমালন্ঠন' জুলাই অভ্যুত্থানকে ওউন করেছে দ্রাঘিমালন্ঠনের টেক্সটেই তা স্পষ্ট। একে সবিনয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এর চিরকালীন ইতিহাসের সময়জ্ঞানহেতু

আর কে রোড: মিডিয়ানথি অনুযায়ী আপনার প্রায় সব সতীর্থের  মধ্যেই সবার শেষে ১ম বই 'কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা' প্রকাশের ৪ বছরের মাথায় পরপর আরো  ৪টি বই করে মাঝের ৪ বছর আর কোনো কাজ আনেননি, এবারে দ্রাঘিমালন্ঠনের মাধ্যমে বলা যায় গুরুত্বপূর্ণ সতীর্থদের মধ্যে সবার শেষে এসে (সাধারণত যেখানে এক্ষেত্রে ট্র‍্যাশের আধিক্যের অভিযোগ অনেকের ক্ষেত্রে জোটে আরকি) প্রায় সবার চেয়ে বইয়ের সংখ্যায় আপনি এগিয়ে থেকেও এমনকি কঠোরভাবে মিডিয়াবহির্ভূত যাপনে স্বল্প পাঠক বেজ নিয়েও সন্তুষ্ট থেকে তরুণ প্রজন্মকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে এলেও ট্র‍্যাশ শব্দটি আপনার কবিতার সাথে খোদ শত্রুও যোগ করতে পারবে না বলেই বিভিন্ন গদ্যে তরুণরা ইভেন অগ্রজেরাও এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, এত শিল্পযাপনব্যস্ততা সত্ত্বেও এই ইন্টিগ্রিটি বা স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারার পিছনের গল্পটি কি জানাবেন আমাদের?

সাজ্জাদ সাঈফ: খুব সোজা কথা। ব্যক্তিজীবনকে আত্মীয় পরিজন হতে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে রেখে জীবনের সব প্রিভিলেজ(জন্মগত সুবিধাদি)কে অগ্রাহ্য করে একটা লড়াকু জীবন বেছে নিয়ে যুগ যুগ ভিন্ন মাটির মফস্বলে লেখকজীবনের যাপনে স্বরচিত নিভৃতি চর্চাসহ লেখাব্যামো পুষবার একটাই কারণ হলো আমার জন্মই হয়েছে কবিতার জন্য শুধু নয় কবিতার মধ্য দিয়ে উপাসনা হতে শুরু করে এস্থেটিক্সের পর সমাজ সংস্কারের দর্শন এক্সপ্লোরেশনের জন্য তাই রাজনীতি আমার কবিতার প্রিয় সাব্জেক্ট আর এর সূত্রপাত পারিবারিক রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড, প্রপিতামহের স্বাধীনতা সংগ্রাম, পিতামহের ন্যাপ সক্রিয়তা, পিতার স্বাধীনতার স্বপক্ষের অবস্থান সত্ত্বেও ফ্যাসিজম কর্তৃক এক জীবনে বহুবিধ আক্রান্ত হবার সমস্ত বাস্তবতাসহই আসলে ভূ রাজনৈতিক পড়াশুনার এক্সটেনশন হিসেবে কবিতাকে ডিল করা আরকি, এক কথায় আমার কাছে আমার কবিতাই আমার ধর্ম আমার কবিতাই আমার রাজনীতি। হ্যাঁ একই ধারাবাহিকতায় শেষতম বইটিও হতে যাচ্ছে জাজমেন্ট ডে'র অনুগামী 'আমি মুহাম্মাদের (সাঃ) লোক'।

আর কে রোড: বিগত দশক হতে অদ্যাবধি আর সবার চেয়ে বহুগুণ বেশিই আপনাকে সাহিত্যমিডিয়া বিরোধী অবস্থানে দেখে যাচ্ছি আমরা, এমনকি প্রথম আলো গ্রুপের বিরুদ্ধেও সিন্ডিকেট ইস্যুতে আপনাকে বরাবরই নিজ অবস্থানে আপোষহীন দেখে আসছি, আপনি কি চান না মিডিয়ার সাথে সুসম্পর্ক জারি রেখে  লাইমলাইটে থাকতে?

সাজ্জাদ সাঈফ: কবিতা লিখতে এসে মানুষে মানুষে সম্পর্কের এত এত খাঁদ মোহভঙ্গ করেছে যে 'বিশ্বাস' শব্দটিকে কবি লেখক সমাজে সংখ্যালঘুই মনে হয়েছে সব সময়, এতটাই বিষাক্ত সব সম্পর্ক, আমার পূর্ণাঙ্গ একলা চলার কারণ এগুলিই, কবিতার জন্য এক জন্ম বাজি রেখে মিডিয়ার মাফিয়াতন্ত্রের সর্ব বিদারী গ্রাস প্রত্যক্ষ করেই ক্রমে সরে যেতে যেতে একলা হয়েছি ভুবনে, কবিতাই শেষমেষ চিরসখা, প্রথম প্রেমের মতনই অধরা সুন্দর, কবিতার জন্য জীবনের হেন টুলস নাই যা বাজি রাখি নাই যারপরনাই আমার সামনে দিয়ে তুলনামূলক কম ঘিলুওয়ালা ভাই ব্রাদার গাড়ি বাড়ি হাকায় মানিয়ে চলি, অসংখ্যের দুই চার বছর কবিতায় এসেই মাফিয়াগোলাম হয়ে যাওয়ার মোহগ্রস্ততা ভিতর হতে কুঞ্চিত করেছে, মায়ের স্বপ্ন পূর্ণ করতে দেয়নি এই কবিতা কবিতা ফ্রিকোয়েন্সি, ভাইয়ের দাবী অমীমাংসিত এই কবিতা কবিতা রিলে রেসে। সেভিংস বলে কিচ্ছুটি নাই জীবনে আছে ৬টি বইই।

এই একটা কাজই আমি পারি আরকি, আর সবকিছু চেষ্টাবিহীন লেগে থাকা কেবল। এজন্যই খ্যাতির রাজনীতি হতে বিমুখ থেকে কবিতাতেই রাগ-প্রেম-সংসার-নাগরিক অধিকার-এবাদত যাবতীয়র আসা যাওয়া, থাকা খাওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আরকি। সাহিত্যমিডিয়াকে আমি বিশ্বাস করি না, তারা এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রেজিমকে সামনে রেখে দেশকে অন্তত পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে রাখতে খ্যাতির রাজনীতি বহাল রেখেছে আজতক, আর সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রশ্নে প্রথম আলো ও জনকণ্ঠসহ অনেক মিডিয়ায় রাখঢাক না রেখেই বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধ শক্তি ভারতের মোদী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মূলতঃ দেশের বিরুদ্ধেই বরাবর স্ট্যান্ড নিয়ে এসেছে এতকাল কিন্তু ভারত সকারকে কোনোদিন সামান্য প্রশ্নবিদ্ধও অব্দি না করে লুতুপুতু বিপ্লবীর মুখোশ পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশকে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ন্যারেটিভের খাদ্যে পরিণত করে চলেছে। এখনো অবধি ভারতীয় মোদী সরকারের সুবিধা নেয়ার আদায়ের মোহে যারা ক্ষেত্রবিশেষে এদের পাতা ফাঁদে পা রেখে খ্যাতি মঞ্চ পুরস্কারকেই জীবনের মূল উদ্দেশ্য করে নিয়েছে তারা যতই গড়মেধার সাহিত্য প্রতিভাকে এই বাংলায় ক্রমাগত হাইলাইটেড করে সমস্ত গণবিরোধী আওয়ামী ন্যারেটিভ বহাল/জারিতে ব্যাতিব্যস্ত তাদের সাথে জুলাইবিরোধী 'আলো আসবেই' গ্রুপের পক্ষ হতে সেই আন্দোলনকারিদের ওপর গরম পানির জলকামান সুপারিশকারিদের ব্যাসিকে কোনো পার্থক্য দেখি না আসলেই। এত এত ফ্যাসিস্ট পন্থার অনুসারী মিডিয়াকে কেন আমার কবিতাযাত্রার সাধনায় ছেদ ঘটাতে দিতে পারি সামান্য মঞ্চ/কবিতাপ্রকাশ/লাইমলাইটের নোংরা হাতছানি মেনে নিয়ে বলো!

আর কে রোড: আবার দ্রাঘিমালন্ঠন প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছি এই বই কি জুলাইয়ের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক অবস্থানকে ওউন করে? দ্রাঘিমালন্ঠনকে আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেন কি না?

সাজ্জাদ সাঈফ: দ্রাঘিমালন্ঠন পাণ্ডুলিপি হাসিনাযুগে প্রিয় প্রকাশনির জুরিরা নিজেদের অস্তিত্বহানি হবার জুজুভয়ডর করে ভয়ংকর অপমান করে বইটা প্রকাশ না করে রিজেক্ট করেছিল, কারণ ছিল একটাই হাসিনাভণ্ডামির বিরুদ্ধে ২৪ এর জুলাইয়ের ঢের আগে হতে মানে ২১-২৩ সালে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছি পাণ্ডুলিপিতে। এবং অবশ্যই যখন ২০১৫ হতে ২০১৮তে লিখিত বই 'মায়ার মলাট'-এ ফ্যাসিস্ট বিরোধী বয়ান উপস্থাপন করি তখন হাসিনাকে উৎখাত করা সাংগঠনিক স্টেক হোল্ডার বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ওউন করা লেখক কবি শিল্পীসহ কথিত মাস্টামাইন্ডদের ভিতরও ফ্যসিবিরোধী সাহসটা সু সংহত হয়ে ওঠে নাই, ২০১৯-২০২১ সময়কালে প্রকাশিত 'ভাষার সি-বিচে', 'বহুদিন ব্যাকফুটে এসে', 'প্রেমপত্রের মেঘ' লিখবার সময়কালে তারা বেশিরভাগই অদূরদর্শীতাহেতু দু'তিনজন কবি শিল্পী ছাড়া সবাইই লিখনিতে রাজনৈতিক দর্শন স্ট্যাবল করতে যথাসময়ে স্ট্যান্ড নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এসব সত্যোচ্চারণের মতই অমোঘ নিয়মে 'দ্রাঘিমালন্ঠন' জুলাই অভ্যুত্থানকে ওউন করেছে দ্রাঘিমালন্ঠনের টেক্সটেই তা স্পষ্ট। একে সবিনয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এর চিরকালীন ইতিহাসের সময়জ্ঞানহেতু।

আর কে রোড: তরুণ কবি লেখক ও শিল্পীদের জন্য জুলাই পরবর্তী পরিস্থিতিতে আপনার কোনো বার্তা দিবার আছে কি?

সাজ্জাদ সাঈফ: তরুণদের জন্য কবিতা বা গল্প উপন্যাস নাটক লিখবার প্রয়োজনে পারলে সারা দুনিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আবশ্যকপ্রায়, ক্রাউডেড সাইলেন্স বা ভীড়েও আত্মনিমজ্জন, নিভৃত শিল্প যাপনের বিকল্প বা শর্টকাট বলে কিছু নাই, বিকল্প নাই জ্ঞানের, বিকল্প নাই মিডিয়ামোহমুক্তির, অতঃপর লিখো হে তরুণ নিজ মগজের জমিদারিতে যে কারো অনুপ্রবেশকে বা নফস বা রুহু হইতে সমস্ত মোহকে প্রতিহত করে আর পড়ো প্রকৃতি পড়ো সৃষ্টিজগত পড়ো যাপিত বাস্তবতা পড়ো সম্পর্কের বন্ধন ও মিথস্ক্রিয়া পড়ো এবং পড়ো।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ